করোনাকাল

সেই কবে কোন ছোটবেলায় পিতামহ শিখিয়েছিলেন,
ক তে কলম, খতে খরগোশ
সেই শিক্ষা বেচেই চলেছে এতদিন।

এখন এই মধ্যবয়সে এসে নতুন করে শিখতে হচ্ছে,
ক তে করোনা, খ তে ভেন্টিলেশন!
কোন মানে হয়?

আমার কাছে করোনা মানে,
হোম অফিস, বাসার কাজে সাহায্য, নেটফ্লিক্স আর ইউটিউব
সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে ভিডিও কল
করোনা পরিসংখান, ভেন্টিলেশন, হার্ড ইমিউনিটি, ভিটামিন-ডি নিয়ে সামাজিক আলাপ।

সামাজিক আলাপ শেষে, নিচে যাই গাড়িটা কিছুক্ষন স্টার্ট দিয়ে রাখতে।
ব্যাটারী যেন ডাউন না হয়। বলা যায় না কখন কোন এমারজেন্সিতে গাড়ি বের করা লাগে।
আমার করোনা কালের দুশ্চিন্তা, গাড়ির ব্যাটারী যেন ডাউন না হয়।

অবশ্য, আর একটা চিন্তা আছে। দূরে থাকেন একাকী বৃদ্ধ বাবা মা।
ফোন করে খোজ নেই, ভালো আছেন তো আপনারা? ব্যাস।

আমি সুদর্শন নই,
তবে করোনা কালে শেভ না করা দাড়ি সহ নতুন ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচারে ভালই লাগে।
নিজেকে কেমন জ্ঞানী জ্ঞানী লাগে।
তো মোটের উপরে এসব নিয়ে ভালোই চলছিল আমার করোনা কাল।

সমস্যাটা শুরু হয়েছে কিছুদিন হল।
নীচে রাস্তায় কারা যেন প্রায়ই চেঁচিয়ে বলে “আম্মা দুইটা সাহায্য করেন”।
কানে লাগানো এয়ারফোনের গুটলি ভেদ করে কলিজায় লাগে, সেই তীক্ষ্ম চিৎকার।

শুধু এটুকু হলে ভালোই হত।
সমস্যা হচ্ছে এখন প্রতিরাতে চোখ বন্ধ করলেই,
কারা যেন কানের কাছে চিৎকার করে বলে, ‘দুইটা সাহায্য করেন’।

আমি খুব মিশুক নই,
তবে এরপরে রাস্তার চায়ের দোকানদার মোতালেব কে জিজ্ঞেস করার সাহস পাই না,
মোতালেব মিয়া, দিন কাল কেমন চলেছে, করোনার মধ্যে?

আমি খুব মানবতাবাদী নই,
তবে রাস্তায় পাশে ত্রানের আশায় বসে থাকা চাচাকে জিজ্ঞেস করার মানবিকতা নাই
কেমন আছেন চাচা? খাইছেন কিছু সকালে?

আমি খুব ভিতু নই,
তবে গ্রামে চলে যাওয়া বুয়াকে রোজার মধ্যে ফোন করে জিজ্ঞেস করার সাহস হয় নি,
কেমন আছেন বুয়া? কেমন কাটছে দিনকাল? ইফতার করলেন কি দিয়ে?

খুব একটা বাসার বাইরে যাইনা,
তবে সকালের প্রায় ফাকা রাস্তায়, বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়না,
চাচা কি রোজা আছেন? সেহেরী করেছেন কি দিয়ে?

দিনমজুর ইসরাফিল, যে আমার বাড়ির টুকটাক কাজ করে দেয়,
ফোনে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়না, ঈদ কেমন হল? বাচ্চারা কেমন আছে? পরিবার?

ছোটবেলার স্কুলের এক বন্ধু, ভাল রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইত স্কুলের ফাংশনে।
মফস্বল শহরে ছোটখাটো একটা চাকুরি করে।
ঈদ বোনাস তো দুরের কথা। দুইমাস বেতন নাই ।
সাহস হয়নি জিজ্ঞেস করার, রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী কেমন কাটছে? পরিবার নিয়ে?

আমার কাছে টাকা ধার চায় নি, এতেই খুশী আমি।
মনে মনে ভাবি, আল্লাহ বাঁচাইছে,
পনের বছর আগে করোনা এলে, আমারো ঠিক একই অবস্থা হইত।

আমি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নই,
তবু চারিদিকে মৃত্যু দেখি, আর ভাবি এই মৃত্যু আমার নয়,
অপমান দেখি আর ভাবি এই অপমান আমার নয়।

করোনার পরিসংখান জানা হয়,
কিন্তু জানা হয়ে উঠে না করোনাকালে তামাটে মানুষেরা কেমন থাকে?
রাস্তার টোকাইরা, সিগনালে ফুল বেচা বাচ্চারা, ভিক্ষুকেরা, ভবঘুরেরা, পাগলেরা,
গুলিস্তানের টাউট হকারেরা, রাস্তার মেয়েরা, দিনমজুরেরা,
রোনিন পাড়ার পাহাড়িরা, দিন-আনে দিন-খায় মানুষেরা?
গ্রাফ দেখা হয়, মানুষ দেখা হয় না।

স্বপ্নে দেখি, পিতামহ নতুন করে বর্নমালা শেখাচ্ছেন
ক তে করোনা, খ তে খোদা
ভাঙ্গাচোরা আমি, নতজানু হয়ে করজোরে প্রার্থনা করি,
কোন অভিশাপে এই শাস্তি! আর কত! থামাও এবার।

জুন ১, ২০২০, ঢাকা ।।
ইকবাল হাবিব খন্দকার

Comments are closed.